/

এমআইটির দুই বাংলাদেশি কন্যার কথা

প্রকাশিতঃ ৪:৫৬ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ২৬, ২০১৮

পরিসংখ্যানটা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতোই বটে! ১৯০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ৮৯২ জন, তাঁদের মধ্যে ৯১ জন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সাবেক শিক্ষার্থী। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে এসেছেন দুনিয়া কাঁপানো অসংখ্য গবেষক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা…। সারা পৃথিবীর কিশোর, তরুণদের কাছে এমআইটি তাই স্বপ্নের শিক্ষাঙ্গন। বাংলাদেশের কয়েকজন শিক্ষার্থীও এমআইটিতে পড়েছেন, পড়ছেন। পাস করে কেউ কেউ দেশে-বিদেশে গবেষণা, শিক্ষকতা কিংবা অন্যান্য পেশায় যুক্ত আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন নাজিয়া চৌধুরী। এমআইটির এই স্নাতক এখন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে গবেষণা করছেন। অন্যদিকে সিলেটের মেয়ে নিশাত ফাহমিদা এ বছরই এমআইটিতে পড়তে যাচ্ছেন। নাজিয়া ও নিশাত—দুজনের সঙ্গে কথা বলেছেন মো. সাইফুল্লাহ

এমআইটিতে বাংলাদেশের একটা সুনাম আছে

নাজিয়া চৌধুরী

এমআইটির আগে ও পরে...
আমি চট্টগ্রামের মেয়ে। ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল ও চট্টগ্রাম কলেজে পড়েছি। ২০০৩ বা ২০০৪ সাল থেকে গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে আমার পরিচয়। শুরুর দিকে রেজাল্ট খুব একটা ভালো ছিল না। ২০০৭ সালে প্রথম জাতীয় পর্যায়ে আসি, গণিত ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই। ২০০৭ থেকে ২০০৯, পরপর তিনবার আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ প্রথম দুটি ব্রোঞ্জ পদক পেল। একটি ছিল আমার। গণিত অলিম্পিয়াডের পদক পাওয়ার পরই আত্মবিশ্বাস জন্মেছিল, হয়তো ভালো কোথাও পড়তে পারব। প্রিন্সটন, স্ট্যানফোর্ডসহ আরও বেশ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলাম। শেষ পর্যন্ত আমি বেছে নিলাম এমআইটি। স্নাতক শেষ হয়েছে ২০১৪ সালে। জীববিজ্ঞান ছিল আমার মেজর (মূল বিষয়)। এখন ডিউক ইউনিভার্সিটি এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের একটা যৌথ প্রকল্পে ‘ডক্টর অব মেডিসিন’ করছি। চার বছরের কোর্স, আমার শেষ বর্ষ চলছে। আমার গবেষণার বিষয় কার্ডিওলজি। এর আগে ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করেছি। পড়া শেষ হলেই দেশে ফিরব। মেডিসিন নিয়ে আরও পড়তে চাই। স্বাস্থ্যনীতি নিয়েও আমার আগ্রহ আছে। সরকারি পর্যায়ে দেশে বড় কোনো পদে কাজ করতে হলে বিসিএস দিতে হয়, তাই মা চান আমি বিসিএস দিই।

ক্যাম্পাসজীবন…
শুরুতে খারাপ দিকটা বলি। পড়ার চাপ অনেক বেশি! নিয়মিত হোমওয়ার্ক করতে হয়। একগাদা সমস্যা, সেগুলোর সমাধান করতে লেগে যায় পুরো সপ্তাহ। সুবিধা হলো, চাইলেই শিক্ষক আর সিনিয়রদের সাহায্য পাওয়া যায়। তাঁরা হয়তো সমস্যার সমাধান করে দেবেন না, কিন্তু ধরিয়ে দেবেন। সে জন্য শুধু সাহায্য চাওয়ার ইচ্ছেটা থাকতে হয়। এমআইটিতে পড়ার মজাও আছে অনেক। ওখানে যেহেতু সবাই মোটামুটি সমমনা, তাই বন্ধুত্ব হতে সময় লাগে না। আমি ডর্মে থেকেছি। রাতে খাবার টেবিলে বসে কত যে গল্প হতো! অর্থনীতি থেকে রাজনীতি, কিচ্ছু বাদ যেত না। মনে আছে একবার রাত দুইটার সময় আমরা আটলান্টিকের পাড়ে বেড়াতে চলে গিয়েছিলাম। মাঝেমধ্যে সবাই মিলে গান গাইতাম। হোক সেটা ইংরেজি কিংবা বাংলা। ভাষা না বুঝলেও সবাই তালি তো দিতে পারে!

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা…

এমআইটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটা সংগঠন আছে। সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য আমরা পুরস্কারও পেয়েছিলাম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা লেগো দিয়ে শহীদ মিনার বানিয়েছি। আমাদের দেখাদেখি বিদেশিরাও বানিয়েছে। রানা প্লাজা ধসের সময় ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ার’ চলছিল। তখন আমরা বাংলাদেশি খাবার বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করেছি। আশপাশে যেসব বাংলাদেশি থাকেন, তাঁরা আমাদের খুব ভালোবাসেন। এমআইটিতে বাংলাদেশের একটা সুনাম আছে।

যাঁরা এমআইটিতে স্নাতক করতে চান, তাঁদের জন্য…

এমআইটিতে ভর্তির জন্য দুটো জিনিস লাগে। ভালো একাডেমিক রেজাল্ট আর কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস (সহ-শিক্ষা কার্যক্রম)। আমি যেহেতু এমআইটির অ্যাডমিশন অফিসে কিছুদিন কাজ করেছি, তাই ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা আছে। কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস বলতে এমন নয় যে আপনাকে কোনো না কোনো অলিম্পিয়াডে পদক পেতে হবে। আপনি হয়তো বিতর্ক করেন, ভালো ছবি আঁকেন, গান গাইতে পারেন। ওরা যেটা দেখে সেটা হলো আপনার ‘প্যাশন’ আছে কি না। আপনি আপনার ক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় মঞ্চটাতে পৌঁছাতে পেরেছেন কি না। একাডেমিক রেজাল্টের ক্ষেত্রে সর্বশেষ ফলটা দেখালেই হবে না। ওরা বেশ দীর্ঘ সময়ের ফল দেখতে চাইবে। বাংলা মাধ্যমের ছেলেমেয়েদের জন্য কলেজের প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষ, টেস্ট, প্রি-টেস্ট, এসবের রেজাল্টও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আপনাকে একজন শিক্ষকের সুপারিশপত্র (রিকমেন্ডেশন লেটার) জমা দিতে হবে। আর লাগবে স্যাট পরীক্ষায় একটা ভালো স্কোর। স্যাটে গণিত ও ইংরেজির দক্ষতা যাচাই করা হয়। আমি যত দূর দেখেছি, গণিতে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের সমস্যা হয় না। আমাদের দুর্বলতা মূলত ইংরেজিতে। এমআইটিতে ভর্তির জন্য কয়েকটা রচনা লিখতে হয়। স্কুল, কলেজে আমরা যেমন রচনা লিখি, তেমন লিখলে কিন্তু হবে না। গল্পের মতো করে সহজ ভাষায় লিখতে হবে। আমি দেখেছি, আবেদনপ্রক্রিয়ার সময় অন্য কাউকে দিয়ে রচনা লেখালে কীভাবে যেন ওরা বুঝে ফেলে। ভালো রচনা লেখার জন্য ছোটবেলা থেকে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য পড়া উচিত। এতে লেখালেখির অভ্যাস হবে, আবার মনও ভালো থাকবে।

স্নাতকোত্তরের জন্য…

ভালো জিপিএ আর গবেষণার বিকল্প নেই। কোনো শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করতে পারেন। গবেষণা নিবন্ধ কোনো জার্নালে ছাপা হলে কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণা উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা থাকলে খুবই ভালো। এমআইটির সুবিধা হলো, ভর্তিসংক্রান্ত যেকোনো জিজ্ঞাসা থাকলে ওদের ই-মেইল করা যায়। ই-মেইলের উত্তর দেওয়ার জন্য আলাদা একটা দল আছে। তাই যেকোনো প্রশ্ন থাকলে ওদের ই-মেইল (admissions@mit.edu) করতে পারেন।

বৃত্তি বা আর্থিক সহযোগিতা…

এমআইটিকে বলা হয় ‘নিড ব্লাইন্ড স্কুল’। যোগ্যতা ও চাহিদা বিবেচনা করে যার যতটুকু দরকার ওরা ততটুকুই আর্থিক সহযোগিতা (ফাইন্যান্সিয়াল এইড) দেবে। বৃত্তির ব্যবস্থা তো আছেই।

প্রত্যাশার কাছে প্রত্যাশা…

প্রত্যাশা (নিশাত ফাহমিদার ডাকনাম) নামে একটা মেয়ে এ বছর এমআইটিতে পড়তে যাচ্ছে, আমি শুনেছি। খুব ভালো লাগছে। আমার পরে আরও তিনজন বাংলাদেশি মেয়ে এমআইটিতে গেছে, প্রত্যাশাকে নিয়ে চারজন হলো। আশা করি, ও নিশ্চয়ই এমআইটিতে ওর সময়টা উপভোগ করবে। পড়াশোনার চাপে হারিয়ে যাবে না। আর বাংলাদেশের সুনাম আরও বাড়াবে।

নিশাত ফাহমিদা এ বছর এমআইটিতে যাচ্ছেন

নিশাত ফাহমিদা

ফিজিকস অলিম্পিয়াড…
আমার জন্য এমআইটির দরজা খুলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড। সিলেটের ব্লুবার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়েছি। উচ্চমাধ্যমিক পড়েছি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে। ছোটবেলায় গণিতের প্রতি আগ্রহ ছিল। ক্লাস ফাইভ থেকে গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি। ক্লাস সেভেন-এইটের দিকে উঠে বুঝতে পারলাম, আমার বেশি ভালো লাগে পদার্থবিজ্ঞান। তখন গণিতের চেয়ে পদার্থবিজ্ঞানটাই বেশি জোর দিয়ে পড়া শুরু করলাম। ফিজিকস অলিম্পিয়াডে অংশ নিলাম। এশিয়ান ফিজিকস অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি ২০১৬ সালে। ২০১৭ সালে গিয়েছি আন্তর্জাতিক ফিজিকস অলিম্পিয়াডে। সেবার আমি ব্রোঞ্জ পেয়েছিলাম।

পদার্থবিজ্ঞান পরিবার…
আমার বাবার নাম আবদুল হান্নান। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়ান। মা সুলতানা রোকেয়া পারভীনও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। তিনি পড়ান সিলেটের সরকারি অগ্রগ্রামী বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে। মা-বাবা পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক বলেই হয়তো পদার্থবিজ্ঞানটা বেশি ভালো লাগে। পদার্থবিজ্ঞানের যেকোনো সমস্যা নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে আলাপ করতে পারি। একটা সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাই না। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, সমস্যার সমাধান পাচ্ছি না বলে সারা রাত ঘুম হয় না। স্কুল-কলেজের পড়ালেখার তুলনায় পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানেই বেশি সময় দিয়েছি। নিয়মিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে গিয়ে কলেজে একটু অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলাম। তাই মা-বাবা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ ছুটে যায়নি।

এমআইটি যাত্রা…

আমি প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম একটু দেরি করে। তবু আশা ছিল, হয়তো হয়ে যাবে। ভর্তির জন্য আবেদন করার সময় ৫টা প্রশ্নের উত্তরে ৫টা রচনা লিখতে হয়। প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরই আমি একটু ভিন্নভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। একটা প্রশ্ন ছিল, আমার জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা কী? যখন সাঁতার শিখতে গিয়েছি, শুরুতে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনাটাই লিখেছি গল্পের মতো করে। প্রশ্নটা আমার কাছে খুব মজার মনে হয়েছে। ভর্তির পুরো প্রক্রিয়ার সময় গণিত অলিম্পিয়াড ও ফিজিকস অলিম্পিয়াডের ভাইয়া-আপুরা ভীষণ সাহায্য করেছেন। যাঁরা দেশের বাইরের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, তাঁরা সব সময় পরামর্শ দিয়েছেন। এখন এমআইটিতে যাওয়ার অপেক্ষা…। এর আগে নাজিয়া আপু, শিঞ্জিনী আপু, ঊর্মি আপু, বৃষ্টি আপুরা এমআইটিতে পড়েছেন। তাঁদের দেখে সাহস পাচ্ছি। বৃষ্টি আপুর সঙ্গে প্রায়ই কথা হয়। কোন কোর্সগুলো আগে নেব, কী করব না করব…এসব নিয়ে আপু পরামর্শ দেন। সেখানকার ক্যাম্পাসজীবন কেমন হবে, ভেবে একটু ভয় ভয় লাগছে। তবে গবেষণাগারগুলোর কথা ভেবে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছি। নিশ্চয়ই সেখানে দারুণ একটা সময় কাটবে।

সূত্রঃ প্রথম আলো