/

কর্মস্থল ঢাকায় বেতন মানিকগঞ্জে, এ কী দুর্ভোগ প্রতিবন্ধীর!

প্রকাশিতঃ 2:27 pm | May 24, 2018

নজরুল ইসলাম একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। হুইলচেয়ারে চলাফেরা। শারীরিক বাধা উপেক্ষা করে তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে (সিএসডি গোডাউন) সহকারী উপপরিদর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন। হঠাৎ মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় বদলি করা হলে নজরুল ইসলামের জীবনে আসে নতুন চ্যালেঞ্জ।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নজরুল যাওবা তিনি ঢাকায় ফিরতে পেরেছেন, বেতন-ভাতা তুলতে হচ্ছে মানিকগঞ্জে গিয়ে। এতে পোহাতে হচ্ছে অশেষ দুর্ভোগ।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন নজরুল ইসলাম। এরপর চাকরির জন্য একের পর এক পরীক্ষা দিতে থাকেন। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে একটি চাকরির জন্য আবেদন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নজরুল ইসলাম খাদ্য অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক হিসেবে চাকরি পান।

চাকরিটা চলছিল নির্বিঘ্নেই। গত বছরের ৮ অক্টোবর নজরুল ইসলামকে তেজগাঁও সিএসডি থেকে মানিকগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে বদলির আদেশ দেন ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক। তেজগাঁও সিএসডির ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির এক দিন পর, ১০ অক্টোবর সেই বদলির আদেশ ছাড় করেন। আদেশ পাওয়ার পরদিন ১১ অক্টোবর নতুন কর্মস্থলে যোগ দেন নজরুল।

খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, এক জায়গায় তিন বছর কর্মরত থাকলে তাঁকে বদলি করার নিয়ম রয়েছে। এ নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে বদলি করা হয়েছে বলে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন।

একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারের বিষয় নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। সেখানে একজন প্রতিবন্ধীর বিষয়ে যাবতীয় নির্দেশনা দেওয়া আছে। আইনের ১৬ (১) (ড)-তে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রসহ প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা’ (রিজনেবল অ্যাকোমোডেশন) দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চলাফেরা, থাকার জন্য উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এই আইন আমলে নেওয়া হয়নি। তাঁর নতুন কর্মস্থল মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে বাসস্থান ও চলাচলের মতো বিষয়ে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা নেই। এসব সুবিধা না থাকায় এবং চাকরির স্বার্থে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ঢাকার তেজগাঁও থেকে নিয়মিত সিঙ্গাইরে যাতায়াত করছিলেন নজরুল ইসলাম। এতে প্রতিবার যাতায়াতে তাঁর খরচ হতো দুই হাজার টাকা। এভাবে দীর্ঘদিন যাতায়াতের পর নজরুল নিজের প্রতিবন্ধিত্ব-বিষয়ক প্রতিকূলতা, শারীরিক সমস্যা ও অসুস্থ বাবার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাইর থেকে ঢাকায় বদলির জন্য অনেক জায়গায় ধরনা দেন।

ঢাকায় আসার জন্য নজরুল যখন বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করছিলেন, তখন ঢাকার সরকারি বাসাটি ছাড়ার জন্য তাঁকে নোটিশ দেন তেজগাঁও সিএসডির ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির। তিনি বাসা ছাড়ার জন্য নজরুল ইসলামকে তিন দফায় নোটিশ দেন। সেই নোটিশে সাড়া না পেয়ে গত ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে আবশ্যিকভাবে নজরুল ইসলামকে বাসা ছাড়ার আদেশ দেন তিনি।

গত ৩১ জানুয়ারি দেওয়া সেই আদেশে ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির লেখেন, ‘শেষবারের মতো আগামী ০৮/০২/২০১৮ তারিখের মধ্যে আবশ্যিকভাবে ও বিনা ব্যর্থতায় বাসা হস্তান্তরের আদেশ দেওয়া হলো। অন্যথায়, আপনার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় নির্দেশ অমান্য ও অসদাচরণের দায়ে উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট বিভাগীয় মামলা আনয়নের জন্য সুপারিশ করা হবে।’

নজরুল ইসলামের বদলির বিষয়ে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নজরুল ইসলামকে তেজগাঁও সিএসডিতে সংযুক্তি হিসেবে বদলি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে মানিকগঞ্জে বদলি করা হয়েছিল। প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষার জন্য আইনে যা বলা আছে, সে অনুযায়ী তো কর্মপরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। এ জন্য অন্য সবার সঙ্গে নজরুল ইসলামকেও বদলি করা হয়েছিল।

জামাল হোসেন আরও বলেন, এক জায়গায় দীর্ঘদিন কাজ করলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হয়। বিষয়টি নিরসন করতে তিন বছর পরপর বদলি করা হয়।

সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য এই কোটা সব সময় পূরণ হয় না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর কর্মস্থলে তাঁদের প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা ‘বিশেষভাবে’ বিবেচনা করা হয় না। অর্থাৎ সরকারি চাকরিতে একজন স্বাভাবিক ব্যক্তির মতো করে একজন প্রতিবন্ধীকে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে বদলি, বাসা বরাদ্দ এবং অন্য বিষয়গুলোও আর বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয় না। এর ফলে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি চাকরি পান ঠিকই, কিন্তু এরপর তাঁদের কী হবে, তা কেউ জানে না।

প্রতিবন্ধীদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন রয়েছে। ফাউন্ডেশনের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) শেখ হামিম হাসান প্রথম আলোকে বলছেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন করা হয়েছে যেন তাঁরা কর্মক্ষেত্রে অবজ্ঞা-অবহেলা কিংবা কটূক্তির শিকার না হন। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বদলি কিংবা অন্য বিষয়গুলো সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হয়ে থাকে। তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যবোধের বিষয়টি সামনে আনতে হবে। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নেগোশিয়েট (আলাপ-আলোচনা) করা যেতে পারে।

শেখ হামিম হাসান বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে কর্মক্ষেত্র থেকে বদলি অথবা অন্য কোনো বিষয়ে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিধান নেই।

তেজগাঁও সিএসডি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে অভিযান চালান র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেখানে একটি চালানে মোট ৩০ টন চালের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ টন চালের ঘাটতি পান আদালত। ৩০ টন চালের ওই চালান ঢাকা-৪ আসনের সাংসদ সৈয়দ আবু হোসেনের নির্বাচনী এলাকার পানিবন্দী মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। পরবর্তী সময়ে ৯ টন চাল কম দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে লিখিত দেন তেজগাঁও সিএসডির ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির। এই ঘটনার পর তিনি ক্ষুব্ধ হন। তিনি মনে করেন, র‍্যাবের অভিযান এবং কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে ‘অনিয়মের’ বিষয়ে খাদ্যগুদামের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তথ্য ‘ফাঁস’ করেছেন। এ কারণে তিনি নজরুল ইসলামসহ আরও বেশ কয়েকজনকে সে সময়ে বদলি করেন।

অভিযোগের বিষয়ে তেজগাঁও সিএসডির ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘বদলি তো আমি করি না। বিধি অনুযায়ী এক জায়গায় তিন বছর পার হলে তাঁকে বদলি করা হয়। শুধু নজরুল নন, তখন ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছিল।’

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, কর্মস্থলে যোগ দেওয়া নতুন কর্মকর্তাদের জন্য বাসার প্রয়োজন, এ জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নজরুল ইসলামসহ সাতজন এখনো বাসা ছাড়েননি। সবাইকে যেভাবে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, নজরুলকেও সেভাবে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

নজরুল ইসলামের প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম গত ৮ এপ্রিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবকে অনুরোধ করেন। পরদিন নজরুল ইসলামকে ঢাকায় বদলির জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন শাখা) মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

সবশেষ ঢাকায় প্রতিবন্ধিতা ও দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো-বিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয় ১৫ মে। তিন দিনের সম্মেলনটি শেষ হয় ১৭ মে। সেখানে অটিজম-বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের কাছে প্রতিবন্ধীদের কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেন নজরুল ইসলাম। সবকিছু জানার পর সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ্ কামালের হস্তক্ষেপে ১৭ মে নজরুল ইসলামকে তেজগাঁও সিএসডিতে ‘সংযুক্তি’তে বদলির আদেশ দেন ঢাকার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জামাল হোসেন। সংযুক্তিতে বদলির মানে হলো, নজরুল ইসলাম কাজ করবেন তেজগাঁও সিএসডিতে, কিন্তু তাঁকে বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা নিতে হবে মানিকগঞ্জ সদর এলএসডি থেকে। সরকারি চাকরিতে সংযুক্তি বদলির ক্ষেত্রে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আমার কাজ করতে পারছি না। আমার সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে। মানিকগঞ্জে কাজ করতে গিয়ে যাতায়াত খরচের কারণে আমি এখন ঋণগ্রস্ত। এখন আমাকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু আমার বেতন-ভাতা নিতে হবে মানিকগঞ্জ থেকে। এভাবে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে হেনস্তা করার কারণ কী, জানি না।’

সূত্রঃ প্রথম আলো